১৩ ভাদ্র ১৪২৫: প্রিয়ন্তিকার সাথে প্রথম কথা, জেদ থেকে ভালোবাসা
অপ্রত্যাশিত সেই ফোন কল
ভাদ্র মাসের ১৩ তারিখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। ক্যালেন্ডারে দিনটা ছিল ২৮শে আগস্ট, ২০১৮। একটা সাধারণ বিকেল, কিন্তু আমার জীবনের একটা অসাধারণ গল্পের সূচনা।
সেদিন মেজাজটা ছিল সপ্তমে। আমার এক বন্ধুর ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙেছে, আর তার পেছনে নাকি প্রিয়ন্তিকার হাত! খবরটা কানে আসা মাত্রই রাগে গা জলছিল। প্রিয়ন্তিকার কাজটা কেন আমার এত গায়ে লেগেছিল, জানি না। হয়তো মনে হচ্ছিল, অন্যের ব্যক্তিগত সম্পর্কে নাক গলানোর অধিকার তোমার কে দিয়েছে?
ফোন হাতে নিয়ে ডায়াল করলাম প্রিয়ন্তিকার নম্বরে, যে নম্বরটা জোগাড় করতে আমার বেশি বেগ হয়নি। কয়েক রিং হওয়ার পর ও পাশ থেকে ফোনটা ধরলো। "হ্যালো?" খুব শান্ত একটা কণ্ঠস্বর।
আমি আমার পরিচয় দিয়ে শুরু করলাম, "আমি নাসির বলছি। তুমি কেন ওদের সম্পর্ক ভাঙলে? এই বয়সে কারো ভালোবাসায় বাঁধা দেওয়ার অধিকার তোমার কে দিল?" আমার কণ্ঠস্বর তখন সপ্তমে চড়া।
প্রিয়ন্তিকা তখন বাসে ছিল, নানুবাড়ি থেকে ফিরছিল। ওর শান্ত কণ্ঠে শুধু একটা শব্দই শোনা গেল, "কে বলছেন?" কিন্তু আমি তখন যেন জেদের বশবর্তী। ওর প্রশ্ন উপেক্ষা করে আমি একের পর এক কথা বলে যাচ্ছিলাম। অভিযোগ, জেরা, তীব্র কথার ঝড়। আমার প্রতিটি শব্দ যেন ছিল তীরের ফলার মতো। মনে হচ্ছিল, ওদিক থেকে নিশ্চয়ই কোনো প্রতিবাদ আসবে, কোনো পাল্টা যুক্তি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, প্রিয়ন্তিকা ছিল একদম চুপ। একটাও কথা বলেনি।
আমার কথা যখন শেষ হলো, আমি একটু থামলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করছিলাম। ও পাশ থেকে শান্ত গলায় প্রশ্ন এলো, "আপনার কথা শেষ হয়েছে?"
আমি তখনও কিছুটা থমকে, অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, "হ্যাঁ..."
তারপর ও শুধু বলল, "তাহলে এখন রাখুন।"
এক মুহূর্তের মধ্যে ফোনটা কেটে গেল। সেই মুহূর্তে আমার রাগ, জেদ সব যেন নিমেষে উধাও হয়ে গেল। শুধু একটা স্তব্ধতা আমাকে ঘিরে ধরলো।
সেদিন রাতে ঘুম আমার চোখে ছিল না। বিছানায় শুয়ে শুধু প্রিয়ন্তিকার চুপ করে থাকা আর শেষ দু'টো কথা কানে বাজছিল। আমি একটা মেয়েকে না বুঝেই কত কথা শুনিয়ে দিলাম! আর সে একটাও পাল্টা কিছু বলল না, এমনকি রাগও প্রকাশ করলো না! তার এই অদ্ভুত নীরবতা আমাকে ভেতর থেকে অস্থির করে তুলল। আমার জেদ কোথায় যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে, তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এক তীব্র অনুশোচনা।
রাত গভীর হতে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ফোনটা হাতে নিয়ে একটা মেসেজ লিখলাম: "Sorry... আমি বুঝে না বুঝেই তোমাকে অনেক কথা বলেছি। ভুল হয়েছে।"
কিছুক্ষণ পর নোটিফিকেশন এলো। দ্রুত মেসেজটা খুললাম। ছোট্ট একটা রিপ্লাই: "ঠিক আছে।"
মাত্র একটা "ঠিক আছে"। এই দুটো শব্দেই যেন আমার ভেতরের সমস্ত কঠিনতা গলে গেল। একটা হালকা স্বস্তি যেন আমাকে ছুঁয়ে গেল। সেই মুহূর্ত থেকেই যেন সব ভুল বোঝাবুঝি, সব রাগ-অভিমান শেষ হয়ে গেল।
শুরু হলো নতুন গল্প
সেই "ঠিক আছে" থেকেই শুরু হলো আমাদের নতুন পথচলা, এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। ধীরে ধীরে ওর সাথে কথা বলতে বলতে আবিষ্কার করলাম ওর সরলতা, ওর উদারতা। ভালোবাসার সম্পর্ক কেন ভেঙেছিল, কেন ও এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে সব কথা শুনলাম শান্ত মনে। বুঝলাম, ওর উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। বন্ধুর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ওর সেদিনের পদক্ষেপ ছিল।
ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো আমাদের এক রঙিন বোঝাপড়া। একসময় যাকে আমি শত্রু ভেবে ফোন করেছিলাম, সেই প্রিয়ন্তিকাই একদিন হয়ে উঠল আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ। সেদিন জানতাম না, একটি ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝি থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রাই একদিন ভালোবাসার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
১৩ ভাদ্র ১৪২৫। একটি তারিখ। যেদিন শুধু ফোনে কথা হয়নি, ভালোবাসার একটি গল্পের শুরুও হয়েছিল নিরবে, নরমে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন